বছর শেষের দুই প্রতিবেদনে চীনের অর্থনীতি সম্পর্কে ইতিবাচক পূর্বাভাস

মহামারী-পরবর্তী অর্থনৈতিক রূপান্তরে একাধিক ধাক্কার মুখোমুখি হয়েছে চীন। বাণিজ্যযুদ্ধ তো রয়েছেই, এর সঙ্গে রিয়েল এস্টেট খাতে হঠাৎ ধস ও শিল্প খাতে অতিরিক্ত সম্প্রসারণের গভীর ক্ষত তৈরি করেছে।

মহামারী-পরবর্তী অর্থনৈতিক রূপান্তরে একাধিক ধাক্কার মুখোমুখি হয়েছে চীন। বাণিজ্যযুদ্ধ তো রয়েছেই, এর সঙ্গে রিয়েল এস্টেট খাতে হঠাৎ ধস ও শিল্প খাতে অতিরিক্ত সম্প্রসারণের গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। অতিচর্চিত এসব তথ্যের পাশাপাশি দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থা এনবিএস পঞ্চবার্ষিক জরিপে অর্থনীতির বেশকিছু উজ্জ্বল দিক তুলে ধরেছে। এতে সংশোধন হয়েছে ২০২৩ সালের প্রবৃদ্ধির তথ্যও। গত বৃহস্পতিবার এ প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। একই দিন চলতি বছর ও ২০২৫ সালের জন্য জিডিপি পূর্বাভাসে ইতিবাচক সংশোধন এনেছে বিশ্বব্যাংক, সঙ্গে যোগ করেছে সংস্কারের পরামর্শ।

জরিপের বরাত দিয়ে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, স্থিতিশীল শিল্পোৎপাদন, হাই-টেক ও ডিজিটাল অর্থনীতির দ্রুত প্রবৃদ্ধি ঘটেছে এ সময়, যা প্রবৃদ্ধির ঐতিহ্যগত চালকগুলোর পতন আংশিকভাবে মোকাবেলা করেছে।

এ বিষয়ে এনবিএস প্রধান কাং ই বলেন, ‘জরিপের ফলাফল থেকে দেখা যাচ্ছে, গত পাঁচ বছরে চীনের অর্থনীতি বিভিন্ন ধরনের অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত ঝুঁকি মোকাবেলা করেছে এবং সাধারণভাবে একটি স্থিতিশীল ও অগ্রগামী উন্নয়ন প্রবণতা বজায় রেখেছে।’

এনবিএসের এ জরিপে চীনের মাধ্যমিক ও তৃতীয় পর্যায়ের সব শিল্প খাত অন্তর্ভুক্ত, যা শিল্পোৎপাদন ও বিদ্যুৎ থেকে শুরু করে আর্থিক খাত ও রিয়েল এস্টেট পর্যন্ত বিস্তৃত।

পঞ্চমবারের মতো পরিচালিত এ জরিপে ২০২৩ সালের কার্যক্রমের বিস্তারিত চিত্র উঠে এসেছে। এপির প্রতিবেদন অনুসারে, এতে ২০২৩ সালে চীনের অর্থনীতি আগের পূর্বাভাসের তুলনায় কিছুটা বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। তবে এ সংশোধন সরকারের ‘প্রায় ৫ শতাংশ’ জিডিপির লক্ষ্যে তেমন কোনো প্রভাব ফেলেনি।

চলতি বছরের শুরুতে চীন সরকার বলেছিল, ২০২৩ সালে দেশটির জিডিপি ছিল ১২৬ দশমিক শূন্য ৬ ট্রিলিয়ন ইউয়ান (১৭ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার)। তবে পঞ্চবার্ষিক জরিপের ভিত্তিতে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি সে তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ১২৯ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ইউয়ান (১৭ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন) হয়েছে। অন্যদিকে ওই বছরে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির আকার ছিল ২৭ দশমিক ৩৬ ট্রিলিয়ন ডলার।

অবশ্য চীনের বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এ সংশোধনের সুনির্দিষ্ট প্রভাব জানানো হয়নি। কর্মকর্তারা বলছেন, আরো বিশদ তথ্য পরে প্রকাশ করা হবে। পূর্ববর্তী পূর্বাভাসের ভিত্তিতে, ২০২৩ সালে চীনের অর্থনীতি আগের বছরের তুলনায় ৫ দশমিক ২ শতাংশ সম্প্রসারণ হয়েছে, যা ২০২২ সালের ৩ শতাংশ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেশি।

এ জরিপে এমন একটি সময় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যখন কভিড-১৯ মহামারী চীনে ব্যবসায়িক কার্যক্রম, ভ্রমণ ও সাধারণ কর্মকাণ্ডে গুরুতর ব্যাঘাত ঘটিয়েছিল। অর্থনীতি এখনো ওই ধাক্কা ও রিয়েল এস্টেটের ঋণাত্মক পরিস্থিতি থেকে পুনরুদ্ধারের পর্যায়ে রয়েছে। এ খাতের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ থেকে সংকটের সৃষ্টি হয়েছিল।

চলতি বছরে কয়েক দফায় সরকার ভোক্তা ব্যয় ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগে মন্দা মোকাবেলায় পদক্ষেপ জোরদার করেছে। স্থানীয় সরকারগুলোর জন্য আর্থিক সহায়তা বাড়াতে ব্যয় বৃদ্ধি ও আরো বন্ড ইস্যুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার আংশিক কারণ রিয়েল এস্টেট খাত।

এফটির এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, চীন সরকারের এমন প্রচেষ্টার মাঝে বিশ্বব্যাংক দেশটির জন্য চলতি বছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সংশোধন করেছে। গত জুনের ৪ দশমিক ৮ থেকে উন্নীত করে ৪ দশমিক ৯ শতাংশের পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।

এছাড়া ২০২৫ সালের জন্য প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ দশমিক ১ থেকে সংশোধন করে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করেছে। তবে পূর্বাভাস অনুযায়ী, সামনের বছরগুলোয় প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে কমে আসবে। ২০২৬ সালের জন্য ৪ শতাংশ গতিতে অর্থনীতি সম্প্রসারণের পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুসারে, চীনের রিয়েল এস্টেট খাতের দুর্বলতা প্রবৃদ্ধিতে অন্যতম প্রতিবন্ধক হিসেবে রয়ে গেছে। বাড়ির দামে পতন ভোক্তাদের খরচ কমাতে বাধ্য করছে। ফলে মূল্যস্ফীতি কম থাকবে, যা এ বছর দশমিক ৪ ও ২০২৫ সালে ১ দশমিক ১ শতাংশে উন্নীত হবে।

প্রণোদনা ও মুদ্রানীতি শিথিলের ঘোষণার পাশাপাশি সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন প্রকল্পে অর্থায়নের মতো সরকারি পদক্ষেপের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এসব পদক্ষেপ ভোক্তা চাহিদা বাড়াতে সহায়ক হলেও উচ্চতর প্রবৃদ্ধি পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট হবে না বলছে বিশ্বব্যাংক। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনা রফতানির ওপর শুল্ক বাড়ানোর ঝুঁকি এবং অন্যান্য বাণিজ্য সীমাবদ্ধতা অর্থনীতির জন্য সম্ভাব্য হুমকি হতে পারে।

বিশ্বব্যাংক ফের চীনের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত ও বৈষম্য কমানোর আহ্বান জানিয়েছে, যাতে চীনের কোটি কোটি নিম্ন আয়ের বা ‘সুরক্ষা সংকটে থাকা মধ্যবিত্ত’ শ্রেণীর জন্য একটি দৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করা যায়। ব্যাংক জানিয়েছে, প্রচলিত উদ্দীপনা নীতিমালা প্রবৃদ্ধি পুনরুজ্জীবিত করতে যথেষ্ট হবে না। বরং শিক্ষা ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা ও পেনশন ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গভীর সংস্কার প্রয়োজন।

অর্থনৈতিক গতিশীলতার নতুন বিশ্লেষণ প্রকাশ করে বিশ্বব্যাংক জানায়, চীনে ২০১০-২১ সময়কালে ৫০ কোটির বেশি মানুষ মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে ছিটকে পড়ার ঝুঁকিতে ছিল। গত ৪০ বছরে ৮০ কোটি মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য বেইজিংকে ‘নাটকীয় সাফল্যের’ জন্যও প্রশংসা জানিয়েছে।

আরও